ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে আর ভাড়া দেওয়া যাবে না – RBI-এর নতুন নিয়মের সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
আজকের দিনে ক্রেডিট কার্ড আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ, ভ্রমণ বুকিং থেকে শুরু করে হঠাৎ জরুরি প্রয়োজনে অর্থের ব্যবস্থা—প্রায় সবক্ষেত্রেই মানুষ ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করে। এই নির্ভরতার মধ্যেই গত কয়েক বছরে একটি বিশেষ ধারা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল—মাসিক বাড়িভাড়া ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া।
ফোনপে (PhonePe), পেটিএম (Paytm) এবং ক্রেড-এর (Cred) মতো ফিনটেক প্ল্যাটফর্মগুলির সাহায্যে ভাড়াটেরা সহজেই তাদের বাড়িওয়ালার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভাড়া পাঠাতে পারতেন। এর সুবিধা ছিল দ্বিমুখী—একদিকে ভাড়া মিটিয়ে দেওয়া গেলো, অন্যদিকে ব্যবহারকারীরা ব্যাংকের দেওয়া রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক এবং সুদমুক্ত ক্রেডিট সুবিধা উপভোগ করতে পারতেন।
কিন্তু সম্প্রতি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) এই ব্যবস্থার ওপর নতুন নির্দেশ জারি করেছে। RBI-এর নির্দেশ অনুযায়ী এখন থেকে শুধুমাত্র কেওয়াইসি (KYC) সম্পন্ন করা ব্যবসায়ী বা রেজিস্টার্ড বাড়িওয়ালার কাছেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া যাবে। অর্থাৎ, সাধারণ বাড়িওয়ালাদের ক্ষেত্রে এই সুযোগ আর নেই।
এই সিদ্ধান্তে লক্ষ লক্ষ ভাড়াটে এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা সরাসরি প্রভাবিত হবেন। অনেকেই ভাবছেন—এতে কি ভাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে? ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা কি আর সেই পুরনো সুবিধা পাবেন না? আর RBI কেন এমন হঠাৎ পদক্ষেপ নিলো? এই প্রতিবেদন সেই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে ধাপে ধাপে।
কিছুদিন আগেও ফিনটেক অ্যাপগুলির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া ছিল একেবারে সহজ। ব্যবহারকারীরা তাদের বাড়িওয়ালার নাম ও ব্যাংক তথ্য অ্যাপে দিয়ে দিতেন, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে অর্থ প্রদান করতেন, আর সেই টাকা সরাসরি বাড়িওয়ালার অ্যাকাউন্টে চলে যেত। এতে একদিকে সময় বাঁচতো, অন্যদিকে ব্যবহারকারীরা বড় অঙ্কের খরচ সামাল দিতে পারতেন সহজে।
কিন্তু RBI-এর নতুন নিয়ম এই প্রক্রিয়ার কাঠামো পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। নির্দেশ অনুসারে, এখন থেকে শুধুমাত্র সেই বাড়িওয়ালারাই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ভাড়া নিতে পারবেন যাঁরা কেওয়াইসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবসায়ী হিসেবে রেজিস্টার্ড। অন্যভাবে বললে, সাধারণ বাড়িওয়ালার কাছে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ভাড়া দেওয়া আর সম্ভব নয়।
ফলে, ফোনপে, পেটিএম এবং ক্রেড-এর মতো কোম্পানিগুলো ভাড়াটেদের জন্য এই সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে যারা প্রতিমাসে এই পরিষেবার ওপর নির্ভর করতেন, তাঁদের এখন বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
সহজ কথায়, আপনার বাড়িওয়ালা যদি এখনো কেওয়াইসি সম্পন্ন না করে থাকেন, তবে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ভাড়া দেওয়ার সুবিধা আপনার জন্য আর কার্যকর থাকবে না। তার বদলে আপনাকে UPI, NEFT, RTGS, IMPS বা চেকের মতো প্রচলিত পদ্ধতিতে ভাড়া দিতে হবে।
এই পরিবর্তন অনেকের কাছে অসুবিধার মনে হলেও RBI-এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা আনা এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার বন্ধ করা।
থমে শুনলে মনে হতে পারে ভাড়া দেওয়া তো একেবারেই স্বাভাবিক আর প্রয়োজনীয় একটি কাজ। তাহলে কেন এটিকে বন্ধ করার প্রয়োজন হলো? আসলে RBI-এর নজরে এসেছে বেশ কয়েকটি গুরুতর অপব্যবহারের ঘটনা।
অনেক ব্যবহারকারী ভাড়া দেওয়ার অজুহাতে আসলে তাদেরই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাচ্ছিলেন। পরে সেই টাকা আবার ফেরত নেওয়া হতো নগদে বা অন্য মাধ্যমে। এর ফলে তাঁরা কৃত্রিমভাবে ক্রেডিট কার্ডের সীমা নগদ অর্থে রূপান্তর করছিলেন। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁরা বিনা খরচে রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ক্যাশব্যাকও পেয়ে যাচ্ছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক একজন ব্যবহারকারী পেটিএমের মাধ্যমে বন্ধুর অ্যাকাউন্টে ২০,০০০ টাকা "ভাড়া" পাঠালেন। বন্ধু সেই টাকা আবার ফেরত দিলো। এদিকে ব্যবহারকারী রিওয়ার্ড পয়েন্ট এবং সুদমুক্ত সময়সীমা পেয়ে গেলেন বিনা কারণে। এই ধরণের ফাঁকফোকর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, যা অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এছাড়াও, এই ধরণের ভুয়া লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা বাড়ছিল। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেই RBI কঠোর পদক্ষেপ নিল।
তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, RBI সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেনি। বরং, কেবলমাত্র কেওয়াইসি সম্পন্ন রেজিস্টার্ড বাড়িওয়ালাদের জন্য এই সুবিধা চালু রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃত ভাড়াটে-বাড়িওয়ালার লেনদেন চলবে, কিন্তু ফাঁকফোকর দিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা আর সম্ভব হবে না।
সবাইয়ের জন্য নিয়ম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এখনও কিছু বাড়িওয়ালা এই সুবিধা দিতে পারবেন, তবে শর্ত রয়েছে।
RBI-এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব বাড়িওয়ালা নিজেদেরকে ব্যবসায়ী হিসেবে কেওয়াইসি সম্পন্ন করে রেজিস্টার করবেন, তাঁরাই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ভাড়া গ্রহণ করতে পারবেন। এর জন্য তাঁদেরকে PAN, আধার, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য নথি জমা দিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে।
কিন্তু এখানে একটি বড় সমস্যা রয়েছে—ভারতের বেশিরভাগ সাধারণ বাড়িওয়ালা এভাবে রেজিস্টার্ড নন। তাঁরা সাধারণত শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দেন এবং ভাড়া সংগ্রহ করেন। ফলে, তাঁরা কেওয়াইসি না করলে এই সুবিধা পাবেন না।
ফলে, প্রাতিষ্ঠানিক বাড়িওয়ালা বা প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলি সুবিধা পাবে, কিন্তু ব্যক্তিগত বাড়িওয়ালারা প্রক্রিয়াটিকে ঝামেলার মনে করতে পারেন। এর ফলে ভাড়াটেদেরও অন্য পদ্ধতিতে অর্থ প্রদান করতে হবে।
সহজ কথায়, সুবিধাটি পুরোপুরি উঠে যায়নি, বরং সীমিত করা হয়েছে কেবলমাত্র সেই বাড়িওয়ালাদের জন্য যারা সঠিকভাবে নথিভুক্ত। এতে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে এবং ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
RBI-এর এই নিয়মের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে ভাড়াটেদের ওপর। যারা প্রতিমাসে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ভাড়া মেটাতেন, তাঁদের এখন অনেক সুবিধা হারাতে হবে।
প্রথমত, তাঁরা আর রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক এবং অফার পাবেন না। দ্বিতীয়ত, তাঁরা আর সুদমুক্ত সময়সীমা ব্যবহার করতে পারবেন না, যা অনেক সময় আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করতো। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি মাসের শুরুতে টাকা না পেতেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ভাড়া মিটিয়ে পরে বেতনের পর বিল পরিশোধ করতেন। এখন সেই সুবিধা আর থাকছে না।
এছাড়াও, অনেকের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থ না থাকায় তাঁরা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন। এতে ভাড়াটে-বাড়িওয়ালার সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বাড়িওয়ালারাও পরোক্ষভাবে সমস্যায় পড়তে পারেন, কারণ অনেক ভাড়াটে হয়তো ভাড়া দিতে দেরি করবেন বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে।
অতএব, এই নিয়ম স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়ালেও, ব্যবহারকারীদের জন্য আর্থিক চাপ ও অসুবিধা তৈরি করবে। RBI-এর উদ্দেশ্য ভালো হলেও এর ফলাফল সাধারণ মানুষের জন্য একটু কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.jpg)